ভারতের ৪০ ভাগ এমপি হত্যা ও ধর্ষণসহ বিভিন্ন মামলার আসামি

ভারতের লোকসভায় নির্বাচিত সদস্যদের ৪০ শতাংশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। এদের মধ্যে একটা অংশ হত্যা ও ধর্ষণ মামলার আসামি এবং এ তালকা আরও বাড়ছে।-খবর এএফপির

শনিবার অ্যাসোসিয়েশন অব ডেমোক্রেটিক রিফর্মস(এডিআর) নামের একটি সংস্থা জানিয়েছে, ভারতীয় পার্লামেন্টে অপরাধীদের তালিকা ক্রমে বাড়ছে।

দেশটির পার্লামেন্টের বিরোধী দলীয় এক সদস্যের বিরুদ্ধে নরহত্যা ও দস্যুতাসহ ২০৪টি মামলা রয়েছে। বৃহস্পতিবার ফল ঘোষণা করা হলে দেখা গেছে, লোকসভার ৫৪৩টি আসনের অন্তত ২৩৩ জন সদস্য ফৌজদারি মামলার আসামি।

এডিআরের নির্বাচনবিষয়ক প্রধান অনিল ভার্মা বলেন, ভারতের পার্লামেন্টে এমন একটা বিরক্তিকরপ্রবণতা রয়েছে। গণতন্ত্রের জন্য এটা ক্ষতিকর।

লোকসভায় বিজয়ী ৫৩৯ জনের ওপর জরিপ চালিয়েছে এডিআর। সংস্থাটি বলছে, ২০০৪ সালে তাদের জরিপ শুরু হওয়ার পর ফৌজদারি অপরাধীদের পার্লামেন্ট সদস্য হওয়ার সংখ্যা এটাই সর্বোচ্চ।

প্রতিবেদন বলছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিজেপি থেকে জয়ী ৩০৩ প্রার্থীর মধ্যে ১১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে একজন সন্ত্রাসবাদের দায়ে অভিযুক্ত।

কংগ্রেস থেকে নির্বাচিত ৫২ এমপির মধ্যে ২৯ জন অপরাধী। কেরালার ইডুক্কি থেকে নির্বাচিত হয়েছেন দীন কুরিয়াকোস। তার বিরুদ্ধে ২০৪টি ফৌজদারি অপরাধের মামলা রয়েছে।

এডিআর বলছে, গত এক দশকে নির্বাচিত পার্লামেন্ট সদস্যদের মধ্যে গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত আসামিদের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। তাদের মধ্যে ১১ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা, ২০ জনের বিরুদ্ধ হত্যাচেষ্টা ও তিনজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে।

বিজেপির এমপি প্রজ্ঞা ঠাকুরের বিরুদ্ধে মসজিদে হামলা চালিয়ে ছয়জনকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। যদিও নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করছেন তিনি।

দলগুলো অনেক সময় তাদের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে আখ্যায়িত করছে।

এবার ভারতে মুসলিম সাংসদের সংখ্যা বেড়ে ২৮

১৯৮৪ সালে ভারতের তৎকালীণ প্রধানমন্ত্রী কংগ্রেস নেত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর পুত্র রাজীব গান্ধী ক্ষমতায় এলে লোকসভায় মুসলিম এমপির সংখ্যা ছিল ৪২ জন। ২০০৪ সালে ১৪ তম লোকসভা এবং ২০০৯ সালে ১৫ তম লোকসভায় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের আমলে লোকসভায় জয়ী মুসলিম সংসদ সদস্যের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৩০ ও ৩৪ জন।

বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের সাংসদে লোকসভা নির্বাচনে মুসলিম সাংসদের সংখ্যা বেড়ে হল ২৮। ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে এই সংখ্যা ছিল ২৩। এর মধ্যে বেশিরভাগ সাংসদরাই ছিলেন কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেসের।

ধুবড়ি থেকে বর্তমান সাংসদ ও এআইইউডিএফ প্রার্থী বদরুদ্দিন আজমল এবং বরপেটা কেন্দ্রে জয়ী হয়েছেন কংগ্রেসের আবদুল খালেক। অথচ এই রাজ্যে মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত।

এবার লোকসভায় সবচেয়ে বেশি মুসলিম সাংসদ তৃণমূলের ৫জন। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে ভারতের ৫৪৩ বিশিষ্ট লোকসভা আসনের (৫৪২ আসনে ভোট হয়) মধ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট পেয়েছে ৩৫৩ টি আসন।

এর মধ্যে বিজেপির একার আসন ৩০২। কিন্তু সংসদে তাদের কোন মুসলিম প্রতিনিধি নেই।
গোটা ভারতজুড়ে ৬ জন মুসলিম প্রার্থী দিয়েছিল বিজেপি। এর মধ্যে কাশ্মীরে তিনজন, পশ্চিমবঙ্গে দুই এবং লাক্ষাদ্বীপে একজন।

কিন্তু একজনও জয়ের মুখ দেখতে পাননি। ২০১৪ সালেও বিপুল ভোটে জিতলেও লোকসভায় গেরুয়া শিবিরের কোনো মুসলিম সাংসদ ছিল না। ভারতের উত্তরপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যা খুব বেশি।

ওই দুই রাজ্য থেকেই মুসলিম সম্প্রদায়ের ছয় জন করে প্রতিনিধি এবার সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন। যদিও ২০১৪ সালে উত্তরপ্রদেশ থেকে একজন মুসলিম প্রার্থীও জয় পায় নি।

কংগ্রেস ছয়জন মুসলিম প্রার্থী দিলেও একজনও জিততে পারেন নি। পশ্চিমবঙ্গ থেকে জয়ী ছয়জনের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে জয় পেয়েছেন পাঁচজন মুসলিম প্রার্থী আর কংগ্রেসের একজন।

যদিও ২০১৪ সালের নির্বাচনে এ রাজ্য থেকে ৮ জন মুসলিম প্রার্থী জয় পেয়েছিলেন। মুসলিম অধ্যুষিত জম্মু-কাশ্মীর থেকে এবার মাত্র তিনজন মুসলিম প্রার্থী লোকসভায় যাচ্ছেন। প্রত্যেকেই ন্যাশনাল কনফারেন্স’র প্রার্থী।

জয়ী প্রার্থীর মধ্যে অন্যতম হলেন শ্রীনগর লোকসভা কেন্দ্রে জয়ী এনসি প্রধান এবং রাজ্যটির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লা। বিহার থেকে এবার সংসদে যাচ্ছেন মাত্র দুইজন মুসলিম প্রার্থী।

অথচ ২০১৪ সালের নির্বাচনে এরাজ্য থেকে চারজন মুসলিম প্রার্থী এমপি হয়েছিলেন। কেরালা থেকে তিনজন মুসলিম প্রার্থী এবার সাংসদ হয়েছেন। আসাম থেকে মুসলিম সাংসদ হয়েছেন দুই জন।

লাক্ষাদ্বীপ থেকে ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি)-র টিকিটে লোকসভায় জয় পেয়েছেন মোহম্মদ ফয়জল। পাঞ্জাবের ফরিদাকোট আসনে জিতেছেন কংগ্রেসের মোহম্মদ সাদিক।

তামিলনাড়ুর রামানাথনপুরম কেন্দ্রে জয় পেয়েছেন ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ প্রার্থী কে.নাভাস কানি। হায়দরাবাদ লোকসভা কেন্দ্রে জয়ী প্রার্থী অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (এআইএমআইএম)’এর প্রধান আসাউদ্দিন ওয়েইসি।

মহারাষ্ট্র থেকে ঔরঙ্গাবাদ লোকসভা কেন্দ্রে জয়ী একমাত্র মুসলিম প্রার্থী হলেন এআইএমআইএম-প্রার্থী ইমতিয়াজ জলিল। ভারতের লোকসভায় সবচেয়ে বেশি মুসলিম সাংসদ ছিল ১৯৮০ সালে।

সেবার সংসদের নিম্নকক্ষে মুসলিম এমপি ছিলেন ৪৯ জন। সবচেয়ে কম মুসলিম সাংসদ ছিল ১৯৫২ সালে, সেবার লোকসভায় তাদের প্রতিনিধি ছিল ১১ জন।

উত্তরপ্রদেশে জয়ী ছয় প্রার্থীর মধ্যে বহুজন সমাজ পার্টি (বসপা) ও সমাজবাদী পার্টি (সপা) উভয়েরই তিনজন করে জয় পেয়েছেন। বসপার তিন জয়ী প্রার্থীরা হলেন গাজিপুর কেন্দ্রে আফজল আনসারি, সাহরানপুর কেন্দ্রে ফজলুর রহমান, আমরোহা কেন্দ্রে দানিশ আলি।

সপার জয়ী তিন প্রার্থী হলেন রামপুরা কেন্দ্রে আজম খান, সম্বল থেকে শফিক রহমান বার্ক, মোরাদাবাদ কেন্দ্রে এসটি হাসান সংসদের যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়েছেন।

মতামত দেওয়া বন্ধ আছে