কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত সরকারের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান যুক্তরাষ্ট্রের

0

কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত সরকারের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ভারতের মিডিয়ায় খবর প্রকাশ হয়েছে যে, ভারতের পরাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর গত ১লা আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও’কে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করার পরিকল্পনা অবহিত করেছেন। কিন্তু সরাসরি এমন রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে।

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যালিস ওয়েলসকে উদ্ধৃত করে এক বিবৃতিতে এমনটা জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ঘটনা মিডিয়ার রিপোর্টের উল্টো। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল করার বিষয়ে আগেভাগে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে অবহিত করেনি ভারত সরকার বা কোনো পরামর্শও করেনি। অ্যালিস ওয়েলস বর্তমানে পাকিস্তান সফরে রয়েছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডন।

ওদিকে কলকাতা প্রতিনিধি জানান, জম্মু কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ভারত কিছুই জানায় নি। ফেব্রুয়ারিতেই ওয়াশিংটনকে ভারত এ বিষয়ে জানিয়েছিল বলে যে জল্পনা ছড়িয়েছিল, তার জবাবে এদিন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, জম্মু কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের বিষয়টি তাদের জানায়নি ভারত।

পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ব্যুরোর পক্ষে টুইটে জানানো হয়েছে, জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে ভারত আলোচনা করেনি বা জানায়নি। টুইটে সই করেছেন কার্যকরি অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি এলিস ওয়েলস।

সোমবার সংবাদ পোর্টাল দ্যা প্রিন্ট খবর দিয়েছিল, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওকে জম্মু কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের বিষয়টি জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। দ্য প্রিন্ট জানিয়েছে, ১লা আগস্ট ব্যাঙ্ককে, নবম পূর্ব এশিয়া বৈঠকের ফাঁকে পম্পেওকে বিষয়টি জানান এস জয়শঙ্কর এবং ফেব্রুয়ারিতে পুলওয়ামা হামলার পর, মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বল্টনকে বিষয়টি জানান ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল।

অবশ্য সোমবার জম্মু কাশ্মীর নিয়ে সরকারের পদক্ষেপের বিষয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, আমেরিকাসহ পাঁচ সদস্য এবং বিদেশী সংবাদমাধ্যমকে অবহিত করেছে ভারত। আমেরিকা ছাড়াও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অন্য স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে রয়েছে চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া এবং যুক্তরাজ্য।

অন্যদিকে ডন লিখেছে, ভারতীয় মিডিয়ায় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের বিষয়ে যে খবর দিয়েছে তাতে বলা হয়েছে, কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের পরিকল্পনা নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে বহুবার যোগাযোগ হয়েছে। এতে দাবি করা হয়েছে, ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে পুলওয়ামা হামলার দু’দিন পরে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ফোন করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বল্টনকে। এ সময়ে তারা কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করা নিয়ে কথা বলেছেন।

একইভাবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ৫ সদস্য রাষ্ট্র ও বিদেশী মিডিয়াকে ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করার বিষয়ে অবহিত করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ডন লিখেছে, এখন কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের বিতর্কিত পদক্ষেপের ফলে পাকিস্তানে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়ার পর ওয়াশিংটন নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখছে বলে বোঝা যায় যুক্তরাষ্ট্রের বিবৃতি থেকে।

পার্লামেন্টের জরুরি যৌথ অধিবেশনে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কুরেশি বলেছেন, এসব বিষয়ে পাকিস্তান জানে না এমন নয়। তিনি বলেন, এ বিষয়ে গত ১লা আগস্ট জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরাঁকে উদ্দেশ্য করে পাকিস্তান একটি চিঠি লিখেছে। তাতে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেয়ার ভারতের সম্ভাব্য পদক্ষেপ সম্পর্কে পাকিস্তান উদ্বেগ জানিয়েছিল। ৩রা আগস্ট এ বিষয়ে জানানো হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে।

আরো সংবাদ

এই মুহুর্তে ঠিক কি হচ্ছে কাশ্মীরে,তার সঠিক তথ্য বাইরের দুনিয়ার মানুষের কাছে নেই!

এই মুহুর্তে ঠিক কি হচ্ছে কাশ্মীরে? তার সঠিক তথ্য বাইরের দুনিয়ার মানুষের কাছে নেই। এমনকি ভারতীয় গণমাধ্যম থেকেও সেখানকার কোনো স্পষ্ট খবর পাওয়া যাচ্ছে না। তবে কাশ্মীরের এক শহর থেকে ফিরে ইনডিয়ান এক্সপ্রেসের এক সাংবাদিক জানালেন কাশ্মীরের ভেতর থেকেও কাশ্মীরকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে!

ভারতীয় গণমাধ্যম ইনডিয়ান এক্সপ্রেসের সহকারী সম্পাদক মোজাম্মেল জলিল ৬ আগষ্ট রাতে কাশ্মীরের শ্রীনগর থেকে দিল্লীতে ফেরেন। দিল্লীতে ফিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংক্ষেপে তুলে ধরেন সেখানকার পরিস্থিতি। জলিল লিখেছেন, ‘সবেমাত্র শ্রীনগর থেকে দিল্লি এসে পৌঁছেছি। পরিস্থিতি এখন ১৮৪৬ সালের বৃটিশ শাসনের চেয়েও খারাপ অবস্থা।

শ্রীনগর সৈন্য এবং কাঁটাতারের ব্যারিকেডের এক শহর। ৫ আগষ্ট পেরাইপোড়া থেকে অফিসে (রেসিডেন্সি রোড) পৌঁছাতে আমার তিন ঘন্টা সময় লেগেছে। ফোন, মোবাইল এবং ল্যান্ডলাইন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ আছে। এটিএম বুথ গুলিতেও কোনো টাকা নেই। কাশ্মীরজুড়ে খুব কঠোর কারফিউ জারি রয়েছে ।

খুব কঠিন পরিস্থিতির ভেতর শ্রীনগরের শহরের অল্প কিছু এলাকাতে ঘোরাফেরা করতে পেরেছি। শহরের একটি ছোট অংশ ছাড়া এর বাইরের আর কোনো তথ্য নেই আমার কাছে। তবে, শুনেছি পুরানো শহর বড়মুলায় বিক্ষোভ হয়েছে। এখানে যাদের সাথেই আমার দেখা হয়েছে তারা প্রত্যেকেই ছিলো হতবাক। সবার ভেতরই এক ধরনেরও অদ্ভুত অসাড়তা দেখা গেছে। আমরা শুনেছি প্রতিবাদ করায় দুজনকে হত্যা করা হয়েছে।

তবে এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারিনি কোনো দায়িত্বশীল ‍সূত্র থেকে। এ তথ্য নিশ্চিত হওয়ার কোনো উপায় আপাতত নেই। কাশ্মীরের ভিতরেও কাশ্মীরকে অদৃশ্য করে তোলা হয়েছে। সাংবাদিকদের সেনাদের নির্দেশিত নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে যাওয়ার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আমি রাজারবাগ থানার বাইরের এক হোটেলের ভেতর থেকে দেখেছি, সেনা প্রহরায় এক টিভি সাংবাদিক বলছেন কাশ্মীর এখন শান্ত আছে!’

এদিকে বিবিসির সাংবাদিক পীরজাদা জানিয়েছেন, ‘ কাশ্মীর এখন রাগে ফুসছে। শ্রীনগর এবং কাশ্মীরের উত্তর ও দক্ষিণের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর পাথর ছোঁড়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে সরকারিভাবে এসব খবরের কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায় নি। রাস্তায় সর্বত্র হাজার হাজার সেনা, পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী টহল দিচ্ছে। সকল রাস্তা বন্ধ। সবখানে জারি হয়েছে কারফিউ।

কাউকে ঘর থেকে বের হতে দেয়া হচ্ছে না। ল্যান্ড ফোন, মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেট ব্লক করে দেয়া হয়েছে।’ অন্যদিকে এখন যেসব কাশ্মীরি জনগণ পেশাগত ও শিক্ষাগতসহ নানা কারণে কাশ্মীরের বাইরে অবস্থান করছেন তারা আছেন উৎকণ্ঠায়। নানা ধরনের গুজব শুনতে পাচ্ছেন বিভিন্ন মাধ্যম থেকে।

কিন্তু কোনো তথ্য সম্পর্কেই কেউ নিশ্চিত হতে পারছে না। কি হচ্ছে সেখানে। ভারতীয় অনুচ্ছেদের ৩৭০ ধারা বাতিলের মাধ্যমে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা হরণ করা হয়েছে। এর ফলে জম্মু ও কাশ্মীর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হওয়ার যেই শর্তে ভারতের সাথে যুক্ত হয়েছিলো সেই শর্তগুলোর বিলুপ্তি ঘটছে।

যা জুম্মু-কাশ্মীরের জণগণের ভেতর ক্ষোভের সঞ্চার সৃষ্টি করেছে। যেকোন উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতি এড়াতে মোদি সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে বিপুল পরিমান সেনা মোতায়েন করছে কাশ্মীরে।