৩০০ বছর আগের বিচার এখন করা হলে অনেক মন্দিরও ভাঙা পড়বে: ভারতের সাবেক বিচারপতি

0

শহীদ বাবরি মসজিদ মামলার রায় নিয়ে ভারতের সুপ্রিমকোর্টের রায় নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন দেশটির সাবেক বিচারপতি অশোক কুমার গঙ্গোপাধ্যায়।

এবিষয়ে তিনি বলেছেন, ‘রায়েই একটা কথা বলা হয়েছে, যেখানে নামাজ পড়া হয় সেই জায়গাকে মসজিদ হিসেবে অস্বীকার করার উপায় নেই। সেই যুক্তিটাকে মেনে যদি আমরা এগোই, তাহলে দেখতে হবে যে এটা সর্বজন স্বীকুত সত্য, বাবরি মসজিদে নামাজ পড়া হচ্ছিল অনেকদিন ধরে। ১৮৫৬/৫৭ সালে নাও হতে পারে,কিন্তু ১৯৪৯ সাল থেকে বটেই, যবে থেকে আমাদের সংবিধান এসছে তবে থেকে এখানে নামাজ পড়া হচ্ছিল। তাহলে আমাদের সংবিধানে স্বীকৃত যে ধর্মাচরণের স্বাধীনতা আছে, সেটাকে রক্ষা করার অধিকারও সংখ্যালঘু (মুসলিম) সম্প্রদায়ের আছে।’

শনিবার (৯ নভেম্বর) বাবরি মসজিদ মামলার রায় ঘোষণার পর সংভাদ চ্যানেল এবিপি আনন্দকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় অশোক কুমার গঙ্গোপাধ্যায় এসব কথা বলেন।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক এই বিচারপতির মতে, ‘৩০০ বছর আগের স্থাপনার মালিকানা ঠিক করা সুপ্রিম কোর্টের কাজ নয়। বরং স্বাধীন ভারতের সংবিধানে প্রতিটি মানুষের ধর্মচারনের স্বাধীনতা দেওয়া উচিত।’

‘যদি ৩০০ বছর আগের বিচার এখন করা হয়, তাহলে অনেক মন্দির মসজিদ ভাঙা পড়বে,’ উল্লেখ করে ভারতের স্বাধীনতার পরের বিষয় নিয়ে বিচার করার পক্ষে মত দেন অশোক কুমার।

‘আমরা স্পেষ্ট দেখেছি এই মসজিদকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এবং সেইটার ব্যাপারে যে মামলা হয়েছিল, সেই ইসমাইল ফারুকির মামলায় তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার বলেছিলেন, এই মসজিদ ধ্বং’স করাটা জাতীয় লজ্জার বিষয়। এবং সরকারের শ্বেতপত্রে ওটাকে (বাবরি মসজিদ) ওনারা একটা ৫০০ বছরের সৌধ বলে উল্লেখ করেছিলেন; এবংবলেছিলেন, এটাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ফলে আমাদের সাংবিধানিক মূল্যবোধও গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো,’ বলেন অশোক কুমার।

সাবেক এই বিচারপতি জানান, এই রায়ের ভিত্তি হলো এএসআই (আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া)। সেখানে এএসআই বলেছে, ওই জায়গার নিচে কোনো একটা কাঠামো ছিল। কিন্তু সেই কাঠামো হিন্দুদের বা মন্দিরের কিনা সেটা বলেনি।

‘যেখানে সুপ্রিম কোর্ট বলছে যে, হিন্দুদের যে দাবি সেই দাবির ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাস। তাহলে বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে তো কাউকে অগ্রাধিকার দেওয়া যায় না। বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে কি কারো মালিকানা ঠিক করা যায়?,’ বলেন অশোক কুমার গঙ্গোপাধ্যায়।

আরো সংবাদ

হিন্দুত্ববাদী চেতনা যে ভারতের আদালতকেও গ্রাস করেছে তার প্রমান বাবরী মসজিদের রায় : আসিফ নজরুল

ভারতের দু’একটা প্রতিষ্ঠান ছিল গর্ব করার মতো। এরমধ্যে অন্যতম সুপ্রীম কোর্ট । কিন্তু হিন্দুত্ববাদী শাসনামলের চেতনা যে এ আদালতকেও গ্রাস করেছে তার প্রমান হচ্ছে বাবরী মসজিদ সংক্রান্ত রায়। তবে এ রায় আমাদের যতো কষ্ট দেক না কেন, মনে রাখতে হবে যে এর সাথে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর কোনরকম সম্পর্ক নেই।

ফলে রায়ের কারণে কেউ যেনো তাদের কোনো ক্ষতি করতে না পারে, সেই ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে আমাদের প্রত্যেককে। কেউ অধম হলে আমরা উত্তম হবে না কেন? নির্মাণ থেকে শহীদ : ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের ৫০০ বছরের ইতিহাস

উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাতে ধ্বংস হওয়া ভারতের উত্তরপ্রদেশের শহীদ বাবরি মসজিদ ভূমি মালিকানার রায় ঘোষণা করেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। রায়ে মসজিদের জায়গা হিন্দুদের মালিকানায় দিয়ে দেয়া হয়েছে। আজ (শনিবার) স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দেশটির প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।

এই বেঞ্চে রয়েছেন বিচারপতি এসএ বোবদে, ডিওয়াই চন্দ্রচূড়, অশোক ভূষণ এবং এস আব্দুল নাজির। রায়ে সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, অযোদ্ধার বাবরি মসজিদের স্থানে রাম মন্দির নির্মিত হবে; বিকল্প হিসেবে বাবরি মসজিদ নির্মাণের জন্য মুসলিম ওয়াকফ বোর্ডকে পাঁচ একর জমি অন্যত্র প্রদান করা হবে।

ভারতীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারতের রাজনীতির একটা বড় অংশ আবর্তিত হয়েছে এই মসজিদের জায়গাকে কেন্দ্র করেই। আসুন যেনে নেই মসজিদটির নির্মাণ থেকে আজকের দিন পর্যন্ত ঐতিহাসিক কিছু ঘটনা। ১৫২৮- মুঘল সম্রাট বাবরের সেনাপতি মীর বাকি বাবরি মসজিদ তৈরি করেন।

১৮৮৫- ফৈজাবাদ জেলা আদালতে বাবরি মসজিদের বাইরে চাঁদোয় টাঙানোর আবেদন জানালেন মহান্ত রঘুবর দাস। আদালতে আবেদন নাকচ হয়ে যায়। ১৯৪৯- মূল গম্বুজের মধ্যে নিয়ে আসা হল রাম লালার মূর্তি। ১৯৫০-রামলালার মূর্তিগুলির পূজার অধিকারের আবেদন জানিয়ে ফৈজাবাদ জেলা আদালতে আবেদন করলেন গোপাল শিমলা বিশারদ।

১৯৫০- মূর্তি রেখে দেওয়ার এবং পূজা চালিয়ে যাওয়ার জন্য মা’মলা করলেন পরমহংস রামচন্দ্র দাস। ১৯৫৯- ওই স্থানের অধিকার চেয়ে মামলা করল নির্মোহী আখড়া। ১৯৬১- একই দাবি জানিয়ে মা’মলা করল সুন্নি সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ড। ১৯৮৬- ফেব্রুয়ারি ১- স্থানীয় আদালত সরকারকে নির্দেশ দেয়, হিন্দু তীর্থযাত্রীদের প্রবেশাধিকার দিতে।

সে সময়ে রাজীব গান্ধী ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ১৯৮৯, ১৪ আগস্ট- এলাহাবাদ হাইকোর্ট নির্দেশ দেয়, বিতর্কিত স্থানে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে হবে। ১৯৯০, ২৫ ডিসেম্বর- বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদবানি গুজরাটের সোমনাথ থেকে রথযাত্রা শুরু করেন। ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯২- উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা বাবরি মসজিদকে শহীদ করে দেয়।

৩ এপ্রিল, ১৯৯৩- অযোধ্যার জমি অধিগ্রহণ করার জন্য বিতর্কিত এলাকার অধিগ্রহণ আইন পাস হয়। এলাহাবাদ হাইকোর্টে এই আইনের বিভিন্ন বিষয়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রিট পিটিশন জমা পড়ে। সংবিধানের ১৩৯ এ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে ওই রিট পিটিশন বদলি করে দেয় সুপ্রিম কোর্ট, যা এখনও হাইকোর্টে বিচারাধীন।

২৪ এপ্রিল, ১৯৯৪- সুপ্রিম কোর্ট ঐতিহাসিক ইসমাইল ফারুকি মা’মলায় রায়ে জানায়, মসজিদ ইসলামের অন্তর্গত ছিল না। ২০০২ এপ্রিল- বিতর্কিত স্থলের মালিকানা নিয়ে হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয়। ১৩ মার্চ, ২০০৩- সুপ্রিম কোর্ট বলে, অধিগৃহীত জমিতে কোনও রকমের ধর্মীয় কার্যকলাপ চলবে না।

১৪ মার্চ- সুপ্রিম কোর্ট বলে, এলাহাবাদ হাইকোর্টে দেওয়ানি মা’মলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য অন্তর্বর্তী আদেশ কার্যকর থাকবে। ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১০- হাইকোর্ট রায় দেয়, মসজিদের জমি সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড, নির্মোহী আখড়া এবং রামলালার মধ্যে সমবণ্টন করে দেওয়া হোক।

এই রায়ে তিন বিচারপতি সহমত পোষণ করেননি। ২-১ ভিত্তিতে রায়দান হয়। ৯মে, ২০১১- অযোধ্যা জমি বিতর্কে হাইকোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্ট। ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬- মসজিদের স্থানে রাম মন্দির তৈরির অনুমতি চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন সুব্রহ্মণ্যম স্বামী। ২১ মার্চ, ২০১৭- প্রধান বিচারপতি জেএস খেহর যুযুধান পক্ষগুলিকে আদালতের বাইরে সমঝোতার প্রস্তাব দেন।

৭ আগস্ট- এলাহাবাদ হাইকোর্টের ১৯৯৪ সালের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে করা আবেদনের শুনানির জন্য তিন বিচারপতির বেঞ্চ গঠন করে সুপ্রিম কোর্ট। ৮ আগস্ট – উত্তর প্রদেশের শিয়া সেন্ট্রাল বোর্ড সুপ্রিম কোর্টে জানায়, বিতর্কিত স্থান থেকে কিছুটা দূরে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় মসজিদ বানানো যেতে পারে।

১১ সেপ্টেম্বর- সুপ্রিম কোর্ট এলাহাবাদ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে নির্দেশ দেয়, বিতর্কিত জমির ব্যাপারে সদর্থক মধ্যস্থতার জন্য দু’জন অতিরিক্ত জেলা বিচারককে ১০ দিনের মধ্যে মনোনয়ন করতে হবে। ২০ নভেম্বর- উত্তর প্রদেশের শিয়া সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ড সুপ্রিম কোর্টকে বলে, অযোধ্যায় মন্দির ও লখনউয়ে মসজিদ বানানো যেতে পারে।

১ ডিসেম্বর- এলাহাবাদ হাইকোর্টে ২০১০ সালের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আবেদন করেন ৩২ জন নাগরিক অধিকার রক্ষা কর্মী। ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮- সুপ্রিম কোর্টে সমস্ত দেওয়ানি মামলার আবেদনের শুনানি শুরু হয়। ১৪ মার্চ- সুব্রহ্মণ্যম স্বামী-সহ সকল অন্তর্বর্তী আবেদন (যারা এই মামলার পক্ষ হতে চেয়েছিল) নাকচ করে সুপ্রিম কোর্ট।

৬ এপ্রিল- ১৯৯৪ সালের রায়ে যে পর্যবেক্ষণ ছিল তা বৃহত্তর বেঞ্চে পুনর্বিবেচনা করার জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানালেন রাজীব ধাওয়ান। ২০ জুলাই- সুপ্রিম কোর্ট রায়দান স্থগিত রাখল। ২৭ সেপ্টেম্বর- পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চে মামলা নিয়ে যেতে অস্বীকার করল সুপ্রিম কোর্ট। জানানো হল, ২৯ অক্টোবর থেকে মামলার শুনানি হবে নবগঠিত তিন বিচারপতির বেঞ্চে।

২৯ অক্টোবর- সুপ্রিম কোর্ট জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে যথাযথ বেঞ্চে মামলার শুনানি স্থির করল, ওই বেঞ্চই শুনানির দিন ধার্য করবে।২৪ ডিসেম্বর- সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্ত নিল, এ সম্পর্কিত।