ঈদের দিনেও কাজে যেতে হয় প্রবাসীদের

উন্নত জীবনের আশায় প্রতিদিন হাজার হাজার যুবক পাড়ি জমাচ্ছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। সুদে টাকা নিয়ে, ভিটা-বাড়ি বন্ধক দিয়ে উচ্চমূল্যে ভিসা নিয়ে, অনেকেই আবার টাকার বিনিময়ে চুক্তি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি জমাচ্ছেন সমুদ্রপথে।

বিভিন্ন দেশে প্রায় এক কোটি প্রবাসী বসবাস করছেন। এই প্রবাসীরা রাত-দিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করছেন শুধু পরিবারের সুখ আর শান্তির জন্য।

কাজের ব্যস্ততার কারণে খেয়ালই থাকে না কোন ফাঁকে যে নিজের জীবনের সুন্দর রঙিন দিনগুলো চলে গেল। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে বাংলাদেশিদের ভিসা জটিলতা, কাজের ক্ষেত্রে নতুন নতুন নিয়ম চালু করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

এ রকম প্রতিকূল পরিবেশে থেকে নিজের কষ্টটুকু বুঝতে দেয় না পরিবারকে। দুই ঈদ ও বিভিন্ন উৎসবে যেমন সবাই আনন্দ করে, প্রবাসীর ঈদের দিনেও কাজে যেতে হয়। কর্মস্থলে সহপাঠীদের সঙ্গে ঈদের আনন্দটুকু ভাগাভাগি করেন নিজেদের মতো করে।

আবার বেশিরভাগ দেশেই নিজ দেশের কারণে বেতন, আকামাসহ নানা ধরনের ঝামেলার মধ্যে দিন কাটে প্রবাসীর। মাস শেষে যখনই বেতন হাতে পায় সেই বেতনের টাকা কখন দেশে পরিবারে কাছে পাঠাবে সেই চিন্তায় অস্থির থাকে।

আবার অনেক সময় দেখা যায় কাজ করেও মাস শেষে ঠিকমতো বেতন পায় না। বেতন দিতে দেরি হলে দেশ থেকে ফোন আসে মাস তো শেষ- টাকা পাঠাও।

পাড়ার দোকানে ও পাওনাদাররা তাড়া দিচ্ছে। কোনো প্রবাসী বিদেশে মারা গেলে বাংলাদেশ সরকার লাশ দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা এবং পরে তিন লাখ টাকা প্রদান করে। কিন্তু কেউ একজন বিদেশে মারা গেলে একটি লাশ কিভাবে দেশে আসে সেই খোঁজ কেউ রাখে না। পাড়া-প্রতিবেশী

আত্মীয়স্বজন গুঞ্জন করে লাশের সঙ্গে কত টাকা আসছে? শুধু মা-বাবা ছাড়া প্রায় সবার মনে এ কৌতূহল জাগে কত টাকা এসেছে কফিনের সঙ্গে। লাশ আসার আগে পাওনাদাররা এসে বসে থাকে টাকার জন্য।

বেশিরভাগ শ্রমিক কম বেতনে কাজ করে যা পায় তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চালায়। সংগঠন বা বন্ধু-বান্ধব মিলে প্রবাসীদের কাজ থেকে টাকা তোলে যে যা পারে সহযোগিতা করে।

এমনও প্রবাসীর মরদেহ হিমঘরের বক্সে পড়ে থাকে যার খোঁজ-খবর নেয়ার কেউ নেই। দেখা যায় এদের মধ্যে বেশিরভাগ নকল পাসপোর্ট বা অবৈধপথে আসা প্রবাসী।

অনেক সময় বাংলাদেশের নাগরিক ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, অন্যদেশে পাসপোর্ট নিয়ে প্রবেশ করেন। তথ্যে গরমিল থাকার কারণে খোঁজ না পেলে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন দেয়া হয়।

দূতাবাসের তথ্যমতে ২০১৭ সালে কুয়েতে ২১৭ ও ২০১৮ সালে ২৫৩ জন প্রবাসী যাদের বেশিরভাগ স্ট্রোক করে মারা গেছে। সাধারণ প্রবাসীরা যখন ধারদেনা শোধ ও পরিবারের কথা চিন্তা করে অতিরিক্ত পরিশ্রম করে একটু বেশি টাকা পেতে নিজের শরীরের প্রতি খেয়াল রাখে না, একটা সময় সে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের বেডে ছটফট করে।

পরিবারে সুখের ও শান্তির জন্য আসা প্রবাসী যখন অসুস্থ হয়ে দেশে যায় কিছুদিন পর টাকার অভাবে সেই প্রবাসী ও তার পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করে। আগে যেই পরিবার দশ জনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলত এখন শরমে আত্মীয়স্বজন কারও কাছে বলতে পারে না। তা

ই বিদেশে প্রত্যেক প্রবাসীর উচিত আগে নিজের শরীরের প্রতি খেয়াল রাখা। মনের প্রশান্তির জন্য কাজের ফাঁকে ছুটির দিনগুলোতে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে মিলিত হলে দুঃখ-কষ্ট কমে, মানসিক চাপ ও অশান্তি কমে যায়।

প্রবাসী তার পরিবারের শান্তি ও সুন্দরের জন্য পরিশ্রম করে নিজের জীবন শেষ করেন। প্রবাস জীবনে কখন ঈদ আসে কখন বিদায় নেয় এই খোঁজ রাখার সময় কোথায়? বাড়ি থেকে ফোন আসে ঈদের জন্য একটু বেশি টাকা পাঠাও। সাদেক রিপন, কুয়েত থেকে

সুবিধাবঞ্চিতদের পাশ কাটিয়ে ঈদ আনন্দ পূর্ণতা পাবে না: শিবির সভাপতি

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি ড. মোবারক হোসাইন বলেছেন, ঈদ আনন্দ ধনী-গরীব সবার জন্য। এখানে কোন বৈষম্য কাম্য নয়। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সুবিধাবঞ্চিতদের পাশ কাটিয়ে ঈদ আনন্দ পূর্ণতা পাবে না।

তিনি আজ রাজধানীতে ছাত্রশিবির আয়োজিত সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাঝে ঈদ সামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। এসময় সেক্রেটারি জেনারেল সিরাজুল ইসলামসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

শিবির সভাপতি বলেন, খুশির বার্তা নিয়ে ঈদ সমাগত। ঈদ আনন্দ পরিপূর্ণ করতে প্রত্যেকেই সাধ্যমত চেষ্টা চালালেও দেশের জনসংখ্যার বিশাল অংশ সুবিধাবঞ্চিত। যাদেরকে বরাবরই পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়।

শুধু পাশ কাটিয়ে যাওয়া নয় বরং সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়ই দেশে দরিদ্র মানুষ নেই বলে ঘোষনা দিয়ে সুবিধাবঞ্চিতদের প্রতি উপহাস করা হচ্ছে।

অথচ দেশে এখন বহু মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস ও মানবেতর জীবন যাপন করছে। এই রমজানেও বহু দুস্থ অসহায় মানুষের খাদ্যকষ্টে থেকে রোজা থাকার করুণ চিত্র গণমাধ্যমের কল্যাণে দেশবাসী দেখেছে।

সামাজিক বৈষম্যের কারণে অসহায় গরীব মানুষরা দিন দিন দারীদ্রের চরম মাত্রায় পৌঁছে যাচ্ছে। ঈদে সমাজের বিত্তবানদের সম্পূর্ণ অংশ দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন না।

অথচ রমজান আমাদের সমাজে সাহায্য-সহযোগিতা, সমবেদনা, সহমর্মিতা প্রদর্শনের শিক্ষা দেয়। ঈদ সবার জন্য ও সার্বজনীন উৎসব। এ আনন্দে দরিদ্র মানুষগুলোকে অসহায় দর্শক বানানো নিতান্তই অমানবিকতা।

তিনি বলেন, সমাজের অসহায়, হতদরিদ্র, ছিন্নমূল মানুষের কষ্ট অনুধাবন করার মোক্ষম সময় হচ্ছে মাহে রমযান। মাহে রমযান আমাদের ত্যাগ-কুরবানীর প্রশিক্ষণ দেয়।

সেই প্রশিক্ষণের উত্তম প্রতিফলন হবে যদি সমাজের সবাই যার যার পাশের সুবিধা বঞ্চিত মানুষের সাথে ঈদ আনন্দকে ভাগাভাগি করে নিতে পারি। ইসলামের সামাজিক শিক্ষাও এটাই।

দেশের অবহেলিত মানুষের প্রধান অভিভাবক রাষ্ট্র। বিত্তশালীদের উপর গরীবের হক আল্লাহপ্রদত্ত। তাদের পাশ কাটানোর প্রবণতা অমানবিক। সরকার ও বিত্তশালীরা যদি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় তাহলে সহজেই ঈদের আনন্দ পূর্ণতা পেতে পারে।

ছাত্রশিবির সবার সাথে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে সাধ্য অনুযায়ী প্রতিবছরই অসহায় দুস্থ মানুষদের সহায়তা করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। ছাত্রশিবির আশা করে, একইভাবে সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।

সবার মাঝে ঈদ আনন্দ যেন সমানভাবে ছড়িয়ে যায় সেজন্য সামর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে অসহায় দরিদ্র সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের সহায়তা করতে হবে।

মতামত দেওয়া বন্ধ আছে